শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
সম্প্রীতির আহ্বানে নবজাগরণ: সারা দেশে বরণ করে নেওয়া হলো নতুন বছর ১৪৩৩ নেছারাবাদে মসজিদের টাকা আত্মসাৎ ও জমি দখলের অভিযোগ সাবেক সচিবের বিরুদ্ধে। নেছারাবাদে খাল খননের উদ্যোগের মাঝেই ভরাটের অভিযোগ, তানভীর মহরির বিরুদ্ধে কোচিং সেন্টার শতভাগ বন্ধ করতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী বরিশালে ষড়যন্ত্রের শিকার স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সজিব-অপপ্রচারের অভিযোগ! নেছারাবাদের নান্দুহার বাজারে তুচ্ছ ঘটনায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাংচুর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহাদয়ের দৃষ্টি আকর্ষন হ্যান্ডবিলেই মিলল খুনের ক্লু, দূরদর্শিতায় প্রশংসায় ভাসছেন নেছারাবাদ থানার ওসি মেহেদী হাসান পিরোজপুরের নেছারাবাদে মাথাবিহীন লাশ উদ্বার।গ্রেফতার ১। যারা বলে টুপি ছাড়া নামায হয় তারা ধোঁকাবাজ- ছারছীনা পীর।

পিরোজপুর-২ আসনে নেছারাবাদের ভোটারই এগিয়ে

পিরোজপুর-২ আসনে নেছারাবাদের ভোটারই এগিয়ে, প্রার্থীদের দৃষ্টি নেছারাবাদ(স্বরূপকাঠি) এর প্রতি। 

অপরাধ তালাশ ডেস্ক: পিরোজপুর-২ আসন এবার শুধু একটি সাধারণ সংসদীয় এলাকা নয়, বিরোধী রাজনীতির জন্য একটি বড় ধরনের পরীক্ষার মাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাউখালী, ভান্ডারিয়া ও নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) এই তিনটি উপজেলা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ১২৮ নম্বর আসনটিতে মোট ভোটার প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজারের বেশি। পুরুষ ও নারী ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান। কিন্তু এই আসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এখানে প্রায় ৪২ শতাংশ ভোটার হিন্দু সম্প্রদায়ের। এত বেশি সংখ্যায় সংখ্যালঘু ভোটার থাকার কারণে এই আসনের নির্বাচন মূলত সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, বিশ্বাস ও আস্থার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

এই নির্বাচনী সমীকরণে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান দুই প্রার্থী একেবারে দুই রকম পথ বেছে নিয়েছেন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থানকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন এবং জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে ভোটারদের রাজি করাতে চাইছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আলহাজ্ব শামীম বিন সাঈদী কথা বলছেন নিরাপত্তা, সহাবস্থান ও স্থানীয় সম্পর্ক নিয়ে। তিনি তার পিতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সামনে রেখে হিন্দু সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করার কৌশল নিয়েছেন। ফলে এই আসনের সংখ্যালঘু ভোটারদের সামনে একদিকে আদর্শিক অবস্থান, অন্যদিকে স্থানীয় নিরাপত্তা ও বাস্তবতা এই দুই ধরনের হিসাব একসঙ্গে সামনে এসেছে।

এই সমীকরণে নেছারাবাদ উপজেলা পুরো আসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটলগ্রাউন্ড হিসেবে উঠে এসেছে। তিনটি উপজেলার মধ্যে গত নির্বাচনের হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়ে নেছারাবাদেই, প্রায় ৮৩ হাজারের মতো। আর একই সঙ্গে এই উপজেলার মধ্যেই রয়েছে আসনের সর্বোচ্চ হিন্দু ভোটার ঘনত্ব। অর্থাৎ স্বরূপকাঠিতে যে প্রার্থী সংগঠিতভাবে এগিয়ে যেতে পারবেন, তিনি পুরো আসনেই বড় সুবিধা নিয়ে সামনে আসতে পারবেন। এ কারণে বিএনপি হোক বা জামায়াত, দুই পক্ষই মূল প্রচারকেন্দ্র হিসেবে নেছারাবাদকেই বেছে নিয়েছে। মন্দির কমিটির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়, স্থানীয় সভা, কার্যালয়ভিত্তিক কর্মী সমাবেশ সবকিছুতেই নেছারাবাদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

এই আসনের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সত্য হলো হিন্দু ভোটারদের অবস্থান। সংখ্যার হিসেবে মুসলিম ভোটার বেশি থাকলেও তাদের ভোট বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। এক অংশ জামায়াতের প্রার্থী সাঈদী পরিবারের নামের টানে যাবে, বাকি অংশ যাবে বিএনপিসহ অন্য বিরোধী ধারায়। ফলে কেবল মুসলিম ভোটের উপর ভর করে কেউই সহজে বিজয়ী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার ভোটে পৌঁছাতে পারবে না। এই ঘাটতি পূরণ করার জন্য হিন্দু ভোটারের এক বড় অংশকে পাশে পাওয়া বাধ্যতামূলক। তাই এই ভোটব্যাংককে আর শুধু গুরুত্বপূর্ণ বলে নয়, সরাসরি নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে হিসাব করতে হচ্ছে।

বিএনপি প্রার্থী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমনের প্রচারে একদিকে রয়েছে আদর্শিক অবস্থান, অন্যদিকে রয়েছে স্থানীয় উন্নয়ন ও সামাজিক কাজের প্রচার। তিনি বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন এবং চেষ্টা করছেন প্রমাণ করতে যে তার পরিবার জামায়াতের ধারার অংশ নয়। একই সঙ্গে তার বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশনের কর্মকাণ্ড, রাস্তাঘাট মেরামত, চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প, কৃষকদের সহায়তা এসব উদাহরণ দেখিয়ে তিনি বলতে চাইছেন যে তিনি শুধু স্লোগানে নয়, কাজেও এলাকায় উপস্থিত রয়েছেন। সে সঙ্গে আওয়ামী লীগ বিরোধী বড় আখ্যানও ব্যবহার করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে ভোটাধিকার হরণ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের কথা তুলে ধরে সব বিরোধী মনোভাবকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা করছেন।

কিন্তু এই আদর্শিক ও উন্নয়নমূলক প্রচারের মাঝেই বিএনপি এক বড় সাংগঠনিক সংকটে পড়েছে। নেছারাবাদে একই সময়ে দুই গ্রুপের আলাদা কর্মসূচি, একদিকে সুমনের সমর্থনে মহিলা দলের সভা, অন্যদিকে উপজেলা পরিষদের সামনে আরেক প্রার্থীর সমর্থকদের প্রতিবাদ সভা এসব ঘটনা সাধারণ ভোটারের চোখে পরিষ্কারভাবে দলীয় বিভক্তির ছবি তুলে ধরছে। তারও বেশি, প্রতিপক্ষ বিএনপি গ্রুপের পক্ষ থেকে সুমনের পরিবারের নির্বাচনী সক্ষমতা নিয়ে কটাক্ষ করা, তাকে এমন পরিবারের সদস্য বলা যারা অতীতে বারবার জামানত হারিয়েছে, এই ধরনের অভিযোগ সুমনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে সরাসরি আঘাত করেছে। ফলে যে প্রার্থী অন্যদের উদ্দেশে ভোট নষ্ট না করার আহ্বান জানাচ্ছেন, তার নিজের জেতার সক্ষমতা নিয়েই মাঠের কর্মী ও সাধারণ ভোটারের মনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

এই অবস্থায় বিএনপি প্রার্থীর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সংগঠনগত ভাঙন। আদর্শিক বার্তা যতই শক্তিশালী হোক, যদি দলীয় ঐক্য দৃশ্যমান না থাকে, তাহলে দোদুল্যমান হিন্দু ভোটারসহ অনেকেই শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি নিতে চাইবে না। কেউ হয়তো নিরাপত্তার হিসাব করে জামায়াতের দিকে তাকাবে, আবার কেউ হয়তো পুরোপুরি ভোটদানে অনীহ হয়ে পড়বে। আর এই ভোটবিমুখতা রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ এত বড় সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া যেকোন পক্ষে জয়ের সমীকরণ পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী শামীম বিন সাঈদী একেবারেই আলাদা ধরনের কৌশল নিয়েছেন। তিনি জানেন, জাতীয় পর্যায়ে তার দল নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক আছে, বিশেষ করে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও স্থানীয় পর্যায়ে তিনি সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও সহাবস্থানের ভাষা ব্যবহার করে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতার একটি নতুন ছবি তৈরি করতে চাইছেন। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও মুসলিম সবাইকে এক পরিবারের মতো থাকার কথায় জোর দিয়ে তিনি বলতে চাইছেন যে স্থানীয় মানুষ যেন মসজিদ বা মন্দির পাহারা দিয়ে রাত কাটাতে না হয়, সবার জীবনযাপন ও ব্যবসা যেন নিরাপদ থাকে। এই ভাষা আদর্শিক লড়াইয়ের বদলে বাস্তব নিরাপত্তার অনুভূতিকে সামনে এনে সংখ্যালঘু ভোটারদের দ্বিধার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

এর সঙ্গে তিনি তার পিতা দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর সময়কার স্থানীয় বাস্তবতার কথা তুলছেন। তিনি দাবি করছেন, তার বাবার সময় এলাকায় হিন্দুরা নিরাপদ ছিল, সম্মানের সঙ্গে বসবাস করেছে, বাড়িঘর দখল বা সংগঠিত নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটেনি। এই স্মৃতির রাজনীতি দিয়ে তিনি বোঝাতে চাইছেন যে যে পরিবার আগে ক্ষমতায় থেকে স্থানীয়ভাবে সবাইকে নিরাপত্তা দিতে পেরেছিল, ভবিষ্যতেও তারা সেই নিরাপত্তা দিতে পারবে। একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধকালীন এবং পাকিস্তান সম্পর্কিত অভিযোগগুলোকেও উল্টোভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন, যাদের অনেকে রাজাকার বলেছে, তাদের তিনি ভিন্নভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন। এতে অন্তত নিজের কোর সমর্থকদের আশ্বস্ত করা যায় এবং কিছু দোদুল্যমান ভোটারের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

পুরো সমীকরণে এখন হিন্দু ভোটারদের সামনে তিন ধরনের পথ খোলা আছে। তারা চাইলে বিএনপির আদর্শিক অবস্থান ও জামায়াতবিরোধী তর্ককে গুরুত্ব দিয়ে বিএনপির দিকে একত্র করতে পারেন, যদি বিএনপি তাদের কাছে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ হিসেবে প্রমাণিত হয়। আবার চাইলে স্থানীয় নিরাপত্তা, সহাবস্থান ও পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জামায়াতের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতামূলক অবস্থানেও যেতে পারেন। আর তৃতীয় পথ হচ্ছে ভোটে না যাওয়া, যা সংখ্যার দিক থেকে এবং রাজনৈতিক প্রভাবের দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করবে সব প্রার্থীর জন্য।

মুসলিম ভোটের ভেতরেও বিভক্তি স্পষ্ট। সাঈদী নামের কারণে জামায়াত একটি শক্তিশালী সংগঠিত কোর ভোট পাবে বলে ধরে নেওয়া যায়। এই ভোট শুধু সংখ্যা নয়, মাঠের কাঠামো, প্রচার, পরিবহন, কেন্দ্রভিত্তিক সংগঠন সবকিছুতেই প্রভাব ফেলবে। বিএনপি প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ হলো বাকি বিরোধী মুসলিম ভোটকে একত্র করা এবং প্রমাণ করা যে তিনি আদর্শিকভাবে জামায়াত থেকে আলাদা এবং একই সঙ্গে জয়ের মতো সাংগঠনিক শক্তিও রাখেন। নেছারাবাদেই এই দুই শক্তির মূল সংঘর্ষ হবে, কারণ এখানেই একদিকে সর্বোচ্চ হিন্দু ভোট, অন্যদিকে শক্তিশালী মুসলিম সংগঠন দুই দিকের চাপ একসঙ্গে কাজ করবে।

সব মিলিয়ে পিরোজপুর-২ আসন এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে জনতাত্ত্বিক হিসাব, নিরাপত্তা-মনস্তত্ত্ব, আদর্শিক রাজনীতি আর দলীয় সাংগঠনিক বাস্তবতা সরাসরি একে অন্যের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। বিএনপি যদি দ্রুত নিজেদের ভাঙন সামলাতে না পারে এবং নেছারাবাদসহ হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য ঐক্য প্রদর্শন করতে না পারে, তাহলে কৌশলগত সুবিধা ধীরে ধীরে জামায়াতের দিকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর যদি শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের সংগঠিতভাবে দাঁড় করাতে পারে এবং হিন্দু ভোটারদের মনে নিরাপত্তা ও প্রতিনিধিত্বের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, তাহলে এই আসনটি সত্যিকারের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে গিয়ে ঠেকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুক পেজ